bangla bhashar

“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো ২১শে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি!”

সত্যি আমরা কেউ ভুলি না ২১ শে ফেব্রুয়ারির কথা। ওপার বাংলার মানুষ তো নয়ই – এপার বাংলার মানুষ ও নয়। ভুলি না সেদিন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ভুলি না রফিক, বরকতদের কথা। কিন্তু ভুলে থাকি ১৯শে মে’র কথা। না, একবছর মনে পরলেও পরের বছর হয়ত ভুলে যাই দিনটার কথা। কারন এই দিনটা কৌলীন্য গরিমায় অনেকটা খাটো ২১ শে ফেব্রুয়ারির কাছে। কিন্তু উদ্দেশ্য তো এক ছিল। এক। নিজের মাতৃভাষা কে সরকারিভাবে আত্মমর্যাদার সঙ্গে প্রতিষ্ঠা দেওয়া। কিন্তু তা হল কই!

সাল ১৯৬০। আসামে অসমিয়া ভাষাকে একমাত্র দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে ঘোষণা করার একটা প্রস্তাব নেওয়া হয়। বাঙ্গালিদের ওপর অসমিয়া ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে ১৯৬১ সালে জন্ম হয় ‘কাছাড় গণসংগ্রাম পরিষদ’ । সেবছরই ১৪ই এপ্রিল শিলচর, করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দির মানুষেরা ‘সংকল্প দিবস’ পালন করেন। ২৪ এপ্রিল থেকে ২রা মে পর্যন্ত চলে দীর্ঘ পদযাত্রা। বরাকের মানুষদের মাতৃভাষা সম্বন্ধে সজাগ করাই ছিল এদের কাজ। সেদিন ঘোষণা করা হয় ১৩ই এপ্রিল ১৯৬১’র মধ্যে বাংলা ভাষাকে সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা না করা হলে ১৯শে মে তারা হরতাল করবেন গোটা বরাক উপত্যকায়।

দাবি না মানায়,  ১৯শে মে হরতাল শুরু হয় গোটা উপত্যকা জুড়ে। শিলচরে রেল স্টেশনে একটা দল সত্যাগ্রহ করছিলেন। এরপর কয়েক ঘণ্টায় অনেক ঘটনার সাক্ষী থাকে ইতিহাস। বিকেল গড়ানোর আগেই স্টেশনের সুরক্ষায় থাকা নিরাপত্তারক্ষীরা ভাষা আন্দোলনকারীদের বন্দুকের বাঁট ও লাঠি দিয়ে মারতে থাকেন।

মাত্র সাত মিনিটের ভেতর ১৭ রাউন্ড গুলি চালায় তারা। ১২ জন মানুষের গায়ে গুলি লাগে সেদিন। বাংলাভাষা রক্ষায় প্রাণ দেন কানাইলাল নিয়োগী, চন্ডীচরণ সূত্রধর, হিতেশ বিশ্বাস, সত্যেন্দ্রকুমার দেব, কুমুদরঞ্জন দাস, সুনীল সরকার, তরণী দেবনাথ, শচীন্দ্র চন্দ্র পাল, বীরেন্দ্র সূত্রধর, সুকোমল পুরকায়স্থ এবং ১৬ বছর বয়েসী কিশোরী কমলা ভট্টাচার্য।

মায়ের ভাষার সম্মান রক্ষায় এদের যেন আমরা ভুলে না যাই। সত্যি, বলুন তো ক’জন মনে রাখি এদের? তবু ধুলো ঝেড়ে এলবামের পাতা ওলটানোর মতন নিজের দেশের ইতিহাসটাও ওলটাতে হয় মাঝে মাঝে। বিশেষ করে নিজের ভাষার ইতিহাস। নিজের পরিচয়ের হৃদয়টুকু যার মধ্যে। বরাক উপত্যকার ইতিহাস এখানেই শেষ নয়। মাতৃভাষার জন্য, বাংলা ভাষার জন্য ১৯৬১ সালের ১৯শে মে’র মত ১৯৭২ আর ১৯৮৬ সালে ঐখানেই তিনটি তরুণ প্রাণ বিসর্জিত হয়। আসুন এদের প্রত্যেকের জন্য আমরা আমরা গর্বিত হই।

আসুন বাংলা ভাষার জন্য গর্বিত হই।

error: Content is protected !!